কাছের মানুষ

এই গল্পটা যাকে নিয়ে তার নাম অথই। কিছুক্ষণ আগে ও এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে। মেডিক্যালের বিছানায় ওর পাশে আমি এখনো বসে আছি। আমি শ্রাবন। আমরা দু’জন বিয়ে করেছিলাম আমাদেও পরিচয়ের দু’দিনের মাথায়। অথই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে তুবও আমি কাঁদছি না; কারণ অথই আমাকে কাঁদতে বারণ করে দিয়েছে।
কী হয়েছে অথই?
দেখ আমার পেটের মধ্যে কি যেন নড়ছে। ভীষন ভয় করছে আমার। একটু তন্দ্রার মতো লেগে এসেছিল, অমনি হঠাৎ নড়ে উঠল। অথই’র পেটের উপর হাত রেখে, অনেক্ষণ অপেক্ষা কওে টের পেলাম, হঠাৎ টোকা দেয়ার মতো সেই নড়া, নড়ে ওঠা। ওই দেখো! অথই চমকে বলে, বোধ হয় শিশুটা।
নড়ছে! শিশুটা নড়ছে! ইস, কী রকম যে লাগছে আমার!
অথই’র পেটের ওপর কান পাতলাম, অপেক্ষা করলাম অনেকক্ষণ। আবার সেই নড়ে ওঠা টের পেলাম। কী রকম পোকার মতো নড়ছে! শব্দটা কিসের! ওটা কি ওর হৃৎপিন্ড, না কি হাত, না কি পা? কে জানে? সে জানান দিচ্ছে যে সে আছে সে আসছে।
যে আসছে সে নড়ছে, কিন্তু অথই হঠাৎ চুপ হয়ে গেল Ñ সাদা চোখে তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। ভয় পেয়ে গেলাম; বুঝতে পারলাম ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। হাতটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম।
তারপর…অ্যাম্বুলেন্স…মেডিক্যালের বিছানায় শুয়ে অথই অদ্ভুত বায়না ধরলোÑএকটা গল্প বলো,
এখন?
হ্যাঁ, এখন। তোমার গল্প শুনে ব্যথা একটু ভুলে থাকি। ওই গল্পটা, তোমার সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুটার গল্প।
তনু। তনুর গল্প শুনে তুমি কি করবে। ও আমার প্রিয় বন্ধু ছিল এটা ঠিক; কিন্তু হঠাৎ করে ওর গল্প কেন?
তুমি বলবে কি না বলো।
আচ্ছা বাবা বলছি-তনু। ক্লাসের সব শেষ বেঞ্চে বসত। সবার সাথেই মারামারি করত। কেউ ওর বন্ধু হতে চাইত না। কিন্তু আমি কি করে যেন ওর বন্ধু হয়ে গেলাম। খুব কাছের বন্ধু। ও যখন রাস্তায় দাড়িয়ে অন্যান্য ছেলের মার থেত, আমি তখন দুওে দাড়িয়ে দেখতাম। মারামারি ঝামেলায় ও আমাকে জড়াতো না। কেউ ওকে মারতে আসছে দেখলেই আমাকে বলত, তুই পালা। কেন বলত, জানতাম না, তবে মাঝে মাঝে বলত- তোর গায়ে কেউ হাত দিলে আমাকে বলবি। এই কথাটা কেন বলত পরে জেনেছিলাম। তনুর সাথে বেড়াতে বেড়াতে আমিও ওর মতো হয়ে গিয়েছিলাম। সবার সাথেই মারামারি শুরু করে দিয়েছিলাম।
একদিন আমি আর ও ফিরছি, রাস্তার মোড়ে কতগুলো ছেলে আমাদেও পথ আগলে দাড়াল। বুঝতে পারলাম বড় একটা মারামারি হবে। তনু আমাকে স্বভাবতই ওই কথাটা বললো, তুই পালা। কিন্তু আমি সেদিন পালালাম না। দেখলাম তনু মার খাচ্ছে। হটাৎ দুটো চেলে এসে আমাকে মারতে শুরু করলো। তনু হঠাৎ ক্ষেপে গেলো, এতক্ষন যে মার খাচ্ছিল, এখন সে মার দিতে শুরু করলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, যে ছেলেটা মার দিতে পাওে সে মার খায় কেন? ওরা যখন পালিয়ে গেল তখন তনু আমাকে মারতে শুরু করলো, আর বলতে লাগল- তোকে না পালাতে বলেছিলাম। সেদিন বুঝলাম তনু আমাকে কত ভালোবাসে।

০২.
আচ্ছা বলো তো আমাদের ছেলে হবে না মেয়ে হবে।
তুমি কি চাও?
আমি চাই মেয়ে হোক।
কেন?
তোমার আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করবে।
সেটা তো ছেলে হলেও করতে পারবে।
জানি। তবু আমার ইচ্ছে মেয়ে হোক।
তারপর বলো।
কী?
গল্পটা শেষ করো।
তারপর আর কি। আমি স্কুল বদল কওে অন্য স্কুলে গেলাম, তনু ওখানেই থেকে গেল। মাঝে মধ্যে আমার স্কুরের সামনে এস দাড়িয়ে থাকত। আমার দিকে তাকিয়ে থাকত ঘৃণা ভরে।
কেন ঘৃণা ভরে তাকাত?
এই প্রশ্নটা আমারও ছিল। যে ছেরেটা আমাকে এত ভালোবাসতো সে কেন ঘৃনা ভওে তাকাত। একদিন ও আমাকে বলেই ফেলল- তোর নতুন বন্ধু হয়েছে তাই না। এ জন্র তুই আমাকে ভুলে গেছিস। বলেই ও চলে গিয়েছিল; আমাকে বোঝানোর সময়টুকু দেয়নি।
অনেকদিন পর দেখি ও আমার স্কুলের গেটে দাড়িয়ে আছে। শক্ত মুখ। ভয়ে ভয়ে কাছে গেলাম। শান্ত গলায় বলল- আমার মা মারা গেছে।
ওর চোখে এতটুকু পানি ছিল না। হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে বললো- মারা গেছে ভালোই হয়েছে; শুধু মারত। বলতে বলতে হয়ত একটু কাঁদল। আমি ওর ঘাড়ে হাত রাখলাম। অনেক দুর পথ হাঁটলাম। তনু কিছুক্ষণ পর পর ওই কথাই বলতে রাগল আর কাঁদতে লাগল। সেদিন আমি আর তনু বাসায় ফিরিনি। আর একদিনের ঘটনা। তনু পরিষ্কার জামা পওে দাড়িয়ে আছে, কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কী খবর?
ে তোকে দেখতে আসলাম। জানিস আমার নতুন মা এসেচে। কথাটা বলে তনু আমার গালে একটা হাত রাখল। তারপর গাঁয়ের জোর দিয়ে আমাকে মারথে লাগল। আমি কিছু না বলে ওর মার খেতে লাগলাম। তারপর যখন শান্ত হলো নিজেই নিজের জামা কাপড় ছিড়ে আমার কাছ থেকে চলে গেল, সেটাই তনুর সাথে আমার শেষ দেখা, তারপর থেকে এখন পর্যন্ত আমি ওর দেখা পাইনি।
হঠাৎ অতই আমার হাত চেপে ধরলো।
কী?
আমি আর পারছি না, ডক্টও ডাক।
ডক্টও ডাকতে যাবো ও আমার হাত চেপে ধরল- আমাকে একা রেখে যেও না।
কিছুক্ষণ পর ডক্টও এসে অথইকে আমার কাছ থেকে ওটিতে নিয়ে গেল।

০৩.
আমি অথই’র পাশে বসে আছি। অথই’র পাশে শুয়ে আছে আমাদের দুজনের স্বপ্ন আমাদেও মেয়ে সুপ্তোষিকা। অথই’র পাশে শুয়ে আছে আর এক অথই। অথই ওকে দেখতে পাচ্ছে না। অথই জানতে ও পারলো না যে ওর স্বপ্ন ওর মেয়ে ওর পাশে শুয়ে আছে।
অথই দেখ, তোমার মতো নাক চোখ, সুন্দর। অথই আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি তোমার মেয়েকে তোমার মতোই কওে গড়ে তুলব। তুমি যেমন আমার গল্প ছাড়া ঘুমাতে পারতে না, আমাদেও সুপ্তোষিকা তাই হবে।
ও হবে আমাদেও সবচেয়ে কাছের মানুষ…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *