ধারাবাহিক ফিকশন : লাল ডাইরি (পর্ব- ২)

দুই
দিন পনেরো পরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ-এর ঢাউস এরোপ্লেনটা যখন শাহজালাল এয়ারপোটের মাটি স্পর্শ করল, তখন ভিজিটাস গ্যালারিতে দাড়িয়ে প্রফেসর আজিজ। ওর পাশে প্রফেসর আজিজের ল্যাবরেটরির আরেক তরুণ গবেষক ডঃ মারুফ রায়হান। তরুণ যুবক, বয়স ছাব্বিশ সাতাশ। উদগ্রীব গলায় মারুফ বলল, “ঐ যে প্রফেসর, যাত্রীরা প্লেন থেকে নামছে। ওর মধ্যে কোন জন লোপা?
মাথা উঁচু করে প্রফেসর দেখতে লাগলেন যাত্রীদের, তারপর হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ঐ যে দেখতে পাচ্ছ, ফরসা লম্বা, মাথায় কালো চুল, প্যান্ট শার্ট পরা। ভিড়ের মধ্যে লোপা কে ঠিক দেখতে না পেরে মারুফ বলল, চলুন প্রফেসর, নিচে যাওয়া যাক। ‘হ্যাঁ, তাই চল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কাস্টমসের ঝামেলা চুকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো লোপা। স্মার্ট, আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল লোপা। প্রফেসর আজিজ হেসে বললেন, ‘ওয়েলকাম টু ঢাকা। এসো তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই। ডঃ মারুফ রায়হান, আমার ল্যাবরেটরিতে রিসার্চ অফিসার। আর এ হলো লোপা। এর কথা তোমাকে আগেই বলেছি।
লোপা হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য।

একটা লাল রঙের মারুতিতে চেপে ওরা রওনা হলে প্রফেসর আজিজের ল্যাবরেটরির দিকে। প্রফেসর আজিজ এর ল্যাবরেটরি এয়ারপোর্ট থেকে খুব একটা দূরে নয়। ভিআইপি রোড দিয়ে এসে বনানী থেকে খানিকটা এগিয়ে। বাঁদিকে ঘুরে গুলশান লেকের পাশে একটা বাগান বাড়ির মধ্যে প্রফেসরের ল্যাবরেটরি বা এনার্জি কমপ্লেক্স। বাগানের মধ্যে দুটো বাড়ি। একটা থাকার জন্য, আরেকটা ল্যাবরেটরি। থাকবার বাড়িটা ছোট দোতলা। কিন্তু ল্যাবরেটরি বাড়িটা বেশ বড়। চারতলা। গাড়ি থামলে ওরা তিনজন গাড়ি থেকে নামল। গাড়ির পেছন থেকে লোপা নিজের মালপত্র নামাতে গেলে প্রফেসর বললেন, ‘না না লোপা, ওগুলো তোমার নামাবার দরকার নেই। ড্রাইভার সেলিমই ওগুলো তোমার ঘরে গুছিয়ে রাখবে। তারপর বলল, জায়গাটা তোমার পছন্দ হচ্ছে।
চারদিকে তাকাল লোপা। স্বীকার করতেই হবে, জায়গাটা বেশ সুন্দর। একটু দূরেই রাস্তার ওপারে গুলশান লেক। ওদিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। এই বাগান বাড়িটাও খুব সুন্দর। প্রায় এক বিঘের মতো জমি। সেই জমিতে কত রকম যে গাছ! দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। নানা ফুলের গাছ। ফলের গাছ মিলিয়ে জায়গাটা স্বপ্নময় মনোরম। আকাশের দিকে তাকিয়ে লোপা দেখল, শরতের ঘন আকাশ, তাতে সাদা মেঘের ভেলা। ওর মনটা খুশি হয়ে উঠল। এই খুশির মধ্যে ওর মনে পড়ল বাবা-মায়ের কথা। এতদূর বাংলাদেশে পাঠিয়ে না জানি ওদের কত চিন্তাই না হচ্ছে। এখন তো ওখানে রাত্তির। ঘুমোবার সময়। কিন্তু ঘুম হচ্ছে কিনা কে জানে!
মারুফ ডাকল, ‘এসো লোপা, বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে কী চিন্তা করছ? তোমার ঘরটা দেখে যাও।’
মারুফ এর কথায় লোপার চিন্তার জাল ছিড়ে গেল। ও ধীরে ধীরে মারুফের পেছন পেছন এগোল। মারুফের আগে সেলিম চলেছে লোপার সুটকেশ নিয়ে। প্রফেসর আজিজ বোধহয় অন্য কোনো দিকে গেছেন।
দোতলায় কোণার দিকে একটা ঘরে লোপার থাকবার বন্দোবস্ত হয়েছে। ঘরটা মাঝারি সাইজের। একটা খাট, একটা টেবিল, দুটো চেয়ার। তাছাড়া সোফা সেটও রয়েছে। সঙ্গে অ্যাটাচড বাথ। ঘরের সামনে লম্বা বারান্দা।
লোপা মারুফের দিকে তাকিয়ে বলল, “এ যে দেখছি রাজসিক আয়োজন! মারুফ কিছু না বলে অল্প হাসল। লোপা জানলার কাছে দাঁড়াতেই ওর চোখে পড়ল, অদূরেই গুলশান লেকের সবুজ থিরথিরে জল। একপাশে একটা উঁচু মাটির ঢিবি। দুপাশে প্রচুর গাছগাছালি।
এই যে লোপা। ঘরটা তোমার পছন্দ হয়েছে তো ?”
পেছন ফিরে লোপা দেখল প্রফেসর আজিজ। খুশির গলায় লোপা বলে, ‘খুব পছন্দ হয়েছে। বাংলাদেশ জায়গাটা যে এত সুন্দর, তা জানতাম না। আপনার ল্যাবরেটরিতে সারাদিন কাজ করব। তারপর এই জানলার কাছে বসেই সন্ধেবেলাটা কাটিয়ে দেব। এভাবেই একটা বছর কেটে যাবে।’
না না, তা কেন। সন্ধেবেলা ঘরে বসে থাকবে কেন। আমার এই এনার্জি কমপ্লেক্সে দুটো গাড়ি আছে। অবসর সময়ে তারই একখানা নিয়ে ঘুরে বেড়াও। কেউ আপত্তি করবে না। মাঝে মাঝে তোমার সঙ্গে আমরাও যেতে পারি।
লোপা কৃতজ্ঞ গলায় বলল, “সব কিছুর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এখানে আসবার ব্যাপারে আমার মায়ের কিছুটা আপত্তি ছিল। কিন্তু দেখছি, এখানে এসে ভুল করিনি।
প্রফেসর আজিজ বললেন, না না, মোটেই ভুল করোনি। শুধু থাকা নয় আমার ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে তুমি এত আনন্দ পাবে, যা আগে কখনো পাওনি। এ ধরনের গবেষণার জন্য এমন আধুনিক ল্যাবরেটরি আর কোথাও নেই। আমি শুধু আমেরিকা নয়, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ঘুরে এসেছি। ওখানে কোথাও এরকম কাজ হচ্ছে না। আমার ল্যাবরেটরি এ কাজে একমেবোদ্বিতীয়ম।
কী লোপা, এই কথাটার মানে বুঝতে পারলে কি? লোপা মৃদু হেসে বলল, হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি। আমার বাবার কাছ থেকে অল্প অল্প সংস্কৃতও শিখেছি তো।
অবাক হয়ে প্রফেসর বললেন, “সে কি, তোমার বাবা সংস্কৃতও জানেন নাকি!
সেলিম ঘরে ঢুকে বলল, “প্রফেসর। বাবুর্চি বলল, খাবার তৈরি হয়ে গেছে। খাবার দিয়ে দেবে কি ?
প্রফেসর লোপার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গোসল করে রেডি হয়ে নিচে ডাইনিং-এ হলে চলে এসো। দেরি করো না।
(চলবে…)
প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন- ধারাবাহিক ফিকশন : লাল ডাইরি (পর্ব-1)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *