ধারাবাহিক ফিকশন : লাল ডাইরি (পর্ব- ১)

প্রফেসর আজিজ বক্তৃতা শেষ করলেন- শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এর পদার্থবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে এই বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন। হল ভর্তি লোক। প্রফেসরের বক্তৃতা শুনতে শুধু আমেরিকা নয়, সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা জড়ো হয়েছেন এখানে। সেই বিজ্ঞানীরা যারা এনার্জি ও ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত গবেষণায় মেতে আছেন।
কয়েক বছর ধরে প্রফেসর আজিজের খুবই নাম ডাক। উনি ইউরেনিয়াম ধাতুর একটি নতুন আইসোটোপ আবিষ্কার করেছেন। সেই নতুন আইসোটোপের সঙ্গে সূর্যরশ্মির বিক্রিয়ায় এমন এক ক্যাপসুল বের করেছেন, যা পৃথিবীর জ্বালানি সমস্যা সহজেই মিটিয়ে ফেলবে। টর্চের ব্যাটারির সাইজের একটা ক্যাপসুল দিয়ে একটা মটর গাড়ি চালানো যাবে এক বৎসর। শুধু মটর কিংবা ট্রাক নয়, এই ক্যাপসুলের মহিমায় বড় বড় কলকারখানাও চালানো যাবে স্বচ্ছন্দে। জ্বালানি ঘাটতির সমস্যা মেটাতে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা যখন হিমসিম খাচ্ছেন, এমন সময় প্রফেসর আজিজের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার স্বাভাবিক কারণেই সারা পৃথিবী জুড়ে আশা ও উৎসাহের সৃষ্টি করেছে।
বক্তৃতা শেষ হতেই উপস্থিত সমস্ত বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা সজোরে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানালেন প্রফেসর আজিজকে। অনেকে নানারকম প্রশ্নও করলেন। প্রফেসর উত্তর দিলেন সকলের কৌতূহল মিটিয়ে। শ্রোতাদের ভেতর থেকে একেবারে শেষে উঠে দাঁড়াল একটি মেয়ে। খুবই কম বয়েসী। কুড়ি বাইশের বেশি নয়। পরনে ফুল প্যান্ট, হাফ শার্ট। ফরসা নরম চেহারা। মাথার চুল কালো। হাবভাবে আমেরিকান মনে হলেও বোধহয় আমেরিকান নয়। খুবই স্মার্ট, তবে মুখের ওপর যেন ছড়িয়ে আছে বিষন্নতা। মেয়েটির পাশে বসে আছেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। সাদা চুল, সাদা দাড়ি। সৌম্যশান্ত চেহারা। হয়তো কোনো বিজ্ঞানী।
মেয়েটি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে পরপর বেশ কয়েকটি প্রশ্ন করল। প্রশ্নগুলি শুনে একটু চমকে উঠলেন প্রফেসর আজিজ। ওর গবেষণার যে জায়গায় একটু সন্দেহ সংশয় আছে, ঠিক সেই জায়গা নিয়েই মেয়েটির প্রশ্ন। প্রশ্নগুলির উত্তর প্রফেসর আজিজের নিজের কাছেই এখনো তেমন স্পষ্ট নয়। কোনো রকমে দায় সারা গোছের উত্তর দিলেন উনি। প্রফেসরের উত্তর শুনে হালকা হাসি ফুটে উঠল মেয়েটির মুখে। আর কেউ বুঝতে না পারলেও প্রফেসর স্পষ্ট বুঝতে পারলেন সেটা। কেমন একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরলো প্রফেসরকে। প্রফেসর মনে মনে ঠিক করলেন, এই অসামান্য বুদ্ধিমতী মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় করতে হবে। জানতে হবে মেয়েটি কে, কী করে।
সভা ভাঙলে অন্য অনেকের সঙ্গে মেয়েটিও ঘিরে দাঁড়াল প্রফেসরকে। প্রফেসর আজিজ ওকে কাছে ডাকলেন, “তোমার প্রশ্ন শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। এত কম বয়সে পদার্থবিদ্যার এত কিছু তুমি আয়ত্ত করলে কী করে ভেবে আশ্চর্য হচ্ছি। তুমি কি কোনো ইউনিভারসিটিতে আছো? ওহো, তোমার নামটাই তো জানা হলো না’
ঝকঝকে হাসিতে চারিদিক ভরিয়ে মেয়েটি বলল, । ‘আমার নাম লোপা। ইলিনয় ইউনিভারসিটিতে পিএইচডি করছি। আমার গবেষণার বিষয়বস্তুও আপনার মতো। – ইউরেনিয়ামের সঙ্গে সূর্যরশ্মির বিক্রিয়া ঘটানো।’
লোপার কথা শুনে প্রফেসর আজিজের মুখে কৌতুহল ফুটে উঠল, “বাঃ বাঃ। খুব ভালো। এতক্ষণে বুঝলাম, তোমার প্রশ্নগুলির উৎস কোথায়। তোমার কাজ সম্বন্ধে খুবই উৎসাহ বোধ করছি। তোমার যদি আপত্তি না থাকে, তবে কি আগামীকাল তোমার সঙ্গে একবার আলোচনায় বসতে পারি?
লোপা কালো চোখের তারা দুলিয়ে উত্তর দিল, ‘স্বচ্ছন্দে। কিন্তু কোথায় ?
‘আমার হোটেলেই হতে পারে। ওখানে লাঞ্চ করতে করতে তোমার সঙ্গে গল্প করা যাবে। আপত্তি নেই তো।’
‘না, একেবারেই না। রিসার্চের কাজ করতে করতে একটা জায়গায় খটকা লাগছে। আপনার মতো একজন প্রফেসরের সঙ্গে আলোচনা করলে সেই খটকা হয়তো দূর হতে পারে। হোটেলের নাম ও ঠিকানা নিয়ে লোপা চলে গেলে প্রফেসর ভাবতে লাগলেন, এ জীবনে অনেক মেয়ে দেখেছেন, কিন্তু এত বুদ্ধিমতী মেয়ে তিনি আগে আর কখনো দেখেন নি। এই মেয়েটিকে যদি বাংলাদেশে নিজের গবেষণাগারে নিয়ে যাওয়া যেত!

পরের দিন ঠিক দুপুর একটায় লোপা হাজির প্রফেসরের হোটেলে। প্রফেসর আজিজ লোপার জন্য হোটেলের লাউঞ্জে অপেক্ষা করছিলেন। অল্প হেসে লোপাকে স্বাগত জানালেন। লাউঞ্জ পেরিয়ে দু’জনে চলে গেলেন রেস্টুরেন্টের ভেতরে।
প্রফেসর বললেন, আজ তোমাকে বাংলাদেশী খাবার খাওয়াবো। তোমার আপত্তি নেই তো! ‘না না, আপত্তি থাকবে কেন? বাংলাদেশী খাবার খুবই ডিলিশাস। যে কোনো বাংলাদেশী জিনিস সম্পর্কেই আমার আগ্রহ। যেমন আপনি, আপনি বাংলাদেশী বলেই বোধ হয় আপনার কাজ সম্পর্কে আমার আগ্রহ এত বেশি। বাবার কাছে শুনেছি, বাংলাদেশ খুবই সুন্দর দেশ। ফ্যাসিনেটিং। ‘তোমার বাবা কি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন?
‘হ্যাঁ, উনি অনেক দিনই কাটিয়েছেন ওখানে। আপনার শহর ঢাকাতেই ছিলেন উনি।
‘বাঃ, দারুণ ব্যাপার! তোমার বাবার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে রইল। অবশ্য এবার হবে না। কালই আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি। পরের বার যখন আমেরিকায় আসব, তখন নিশ্চই তােমার বাবার সঙ্গে পরিচয় হবে।
ওয়েটারকে ডেকে বাংলাদেশী খাবারের অর্ডার দিলেন প্রফেসর আজিজ। এই হোটেলে বাংলাদেশী- ভারতীয় খাবার পাওয়া যায়। মাটন বিরিয়ানি, তন্দুরি রুটি, চিকেন দোপিয়াজি, আলু কপি, রায়তা, চাটনি, দই, রসগোল্লা। খাবার খেতে খেতে নিচু গলায় গবেষণার নানা খুটিনাটি বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে অনেক আলােচনা হলো। লোপার সঙ্গে আলোচনা করে প্রফেসর আজিজ খুবই খুশি। দেশীয় খাবারের স্বাদ পেয়ে লোপাও খুবই পরিতৃপ্ত।
খাওয়া দাওয়া সেরে মুখ মুছতে মুছতে হঠাৎ প্রফেসর বললেন, ‘তুমি কি ঢাকায় আসবে? মানে আমার গবেষণাগারে কাজ করবে? তোমাকে ভালো টাকা দেব আমি। তুমি এখানে ইউনিভারসিটিতে যত টাকা পাচ্ছ, ততটা না হলেও প্রায় কাছাকাছি। বলো যাবে?
প্রফেসরের কথা শুনে লোপার গালে টোল পড়ল। ওর কালো চোখের তারা দুটো ঝিকিয়ে উঠল। প্রফেসর সাগ্রহে আবার বললেন, “চুপ করে থেকো না লোপা। বলো ঢাকায় যাবে কিনা?
দু’তিন মিনিট চুপ করে থেকে লোপা বলল, “যাব, তবে টাকার জন্য নয়। নতুন ধরনের কাজের সুযোগের জন্য’ । ‘আঃ তুমি বাঁচালে আমাকে। তোমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়েকে সঙ্গে পেলে আমার গবেষণা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। কিন্তু তোমার বাবা আপত্তি করবেন না তো ।
চোখ বুজে গভীর স্বরে লোপা বলল, “না, বাবা আপত্তি করবেন না। আমার কোনো কাজেই তিনি আপত্তি করেন না কখনো। ‘বাঃ, তাহলে তো ভালোই হলো। তা তুমি কবে আমার কাজে যোগ দিচ্ছ?
‘দিন পনেরোর মধ্যে। এখানে কিছু কাজকর্ম বাকি আছে। সেগুলো সেরেই ঢাকার পথে পাড়ি দেব। (চলবে…)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *